“কিভাবে মাদকাসক্তি কাটিয়ে উঠবেন?” প্রশ্নটি একজন মাদকাসক্তের মনে সর্বদয় উকি দেয়। ওষুধ আবিষ্কারের পর থেকেই একটি বহুল আলোচিত মানসিক এবং শারীরিক স্বাস্থ্য জনিত জটিলতা হচ্ছে মাদকাসক্তি। এটি এমন একটি আলোচিত বিষয় যা মানুষকে তার ব‍্যক্তিগত জীবন ও সামগ্রিকভাবে সমাজ থেকেও অনেক কিছু হারাতে বাধ‍্য করে। আমরা মাদকাসক্তির অসুবিধা এবং বিপদগুলো সম্পর্কে জানি এবং এটি কিভাবে আমাদের এবং সমাজকে প্রভাবিত করে সে সম্পর্কেও আমরা জানি। তবে আমাদের এটাও বুঝতে হবে যে মাদকাসক্তি থেকে মুক্তি পাওয়া খুব একটা সহজ নয়।

আসক্তি মানসিক অসুস্থতার একটি গুরুতর স্তর যা পরে মারাত্মক শারীরিক অসুস্থতার সম্মুখীন করে। তাই পরিবারের কোনো সদস‍্য বা বন্ধু মাদকে আসক্ত হলে তা সকলকে উদ্বিগ্ন করে তুলে। এমনকি এটা নিজের ক্ষেত্রেও হতে পারে, যদি আপনি বুঝতে পারেন যে আপনি মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েছেন তবে অবশ‍্যই আপনাকে তা কাটিয়ে উঠতে হবে।

সম্ভবত আপনি বা আপনার আপনজন একবার বা একাধিক বার চেষ্টা করেছেন কিন্তু আবার আসক্তিতে ফিরে গেছেন তাই আজ আপনি এই ওয়েবসাইটে ক্লিক করেছেন। আসক্তি দূর করা বলা সহজ কিন্তু করা কঠিন বিশেষ করে যখন এটি মাদকের সাথে যুক্ত থাকে। যাইহোক এর বিপরীতে মাদকাসক্তি থেকে মুক্ত হওয়ার অনেক সুবিধা রয়েছে।

মাদকের আসক্তি কাটিয়ে উঠা কি সম্ভব?

এর উত্তর হচ্ছে হ‍্যাঁ, তবে আসক্তি কাটিয়ে উঠা যতটা সহজ মনে হয় ততটা সহজ নয়। কারন মাদকের আসক্তি আপনাকে সর্বদা এর দিকে আকৃষ্ট করে। ইতিমধ্যে দেখা গেছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মাদকাসক্তির গুরুতর প্রভাব রয়েছে এতে। তবে তারা যদি চেষ্টা করে এবং সঠিক চিকিৎসা গ্রহন করে তাহলে আশার আলো আবশ্যই আছে।

যদি সত‍্যিই আপনি আসক্তি কাটিয়ে উঠতে চান তাহলে এমন অনেক বিষয় রয়েছে যা সম্পর্কে আপনাকে সচেতন হওয়া দরকার। আপনার অবশ্যই জানা উচিত মাদকদ্রব্যে মানুষের কেন এত আসক্তি এবং কেনোই বা তা মানুষকে প্রভাবিত করে। আমরা অনেকেই মনে করি যে শারীরিক দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে এ থেকে দ্রূত মুক্তি পাওয়া যায় কিন্তু এর উপর মানসিক স্বাস্থ্যের যে ব‍্যাপক প্রভাব রয়েছে তা আমরা অনেকেই বুঝতে পারি না। মস্তিষ্ক আমাদের মনকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং এটি এমন কিছু হরমোন তৈরি করে যা আমাদের মস্তিষ্ককে নিয়ন্ত্রণ করে। এই জাতীয় হরমোনের মধ্যে একটি হচ্ছে ডোপামিন।

ডোপামিন আমাদের খুশি আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাই অনেক চিকিৎসকরাও একে সুখী হরমোন বলে থাকে। এই সুখী হরমোনের সাথে মাদকাসক্তির কি সম্পর্ক? যখন মাদক আমাদের শরীরে প্রবেশ করে তখন এটি আমাদের মস্তিষ্ককে উচ্চ মাত্রার ডোপামিন হরমোন তৈরির সংকেত দেয়। মস্তিষ্ক তার গ্রহণ করা ওষুধের সংখ‍্যা অনুযায়ী ডোপামিন তৈরি করে। যদিও ডোপামিন অন্য যেকোন খুশির ঘটনার মাধ্যমেও তৈরি হতে পারে তবে যখন কোনো ব‍্যক্তি মাদক সেবন করেন তখন তাদের মস্তিষ্ক এটির উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠে। এজন্য অনেক রোগী প্রায়শই মাদকের আসক্তিতে ফিরে যায়।

সুসংবাদ হল, একটি আশার আলো রয়েছে এবং আপনি যদি আপনার খারাপ অভ‍্যাস থেকে মুক্তি পেতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হন তবে সেখানে আশার আলো রয়েছে। ওষুধে এমন একটি পদার্থ রয়েছে যা মস্তিষ্কের কার্যকলাপকে ৬০% পর্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে পরিবর্তন করে। তাই আরোগ্য লাভ কিছুটা কঠিন হতে পারে। তবে একটি বিশেষজ্ঞ সমীক্ষায় দেখা যায় যে কিশোর এবং বিংশ দশকের যারা মাদকে আসক্ত ছিলো তাদের ৩০% নিজেদের পুরোপুরি মাদক মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। তাদের বেশিরভাগকেই পুনর্বাসন এবং মাদকাসক্তি কেন্দ্রের সহায়তা দেয়া হয়েছিল।

দৈনন্দিন জীবন

মাদকের আসক্তি কাটিয়ে উঠার উপায়

আসক্তিকে মোকাবেলা করাটা কোনো ব‍্যক্তিকে মোকাবেলা করার থেকে কম নয় বা এর অর্থ এই নয় যে আপনার কোনো ত্রুটি রয়েছে। কিভাবে সত‍্যি এটি কাটিয়ে উঠা যায় সে দিকে আপনাকে মনোনিবেশ করতে হবে।

যেমনটি আগে বেশ কয়েকবার উল্লেখ করা হয়েছে, মাদকাসক্তি মস্তিষ্কের অভ‍্যন্তরীন ক্রিয়াকে পরিবর্তিত করে এবং এর অনেকগুলো তার উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠে। এ কারণে অনেকের পক্ষে এটিকে জয় করা কঠিন হয়ে যায়। বদঅভ‍্যাস পরিবর্তন এবং কাটিয়ে উঠার সিদ্ধান্ত নিজের মধ‍্যে সাহস সঞ্চয় করে। কঠোরতা ছাড়াও সেখানে সর্বদা আশা থাকে এবং আপনি যদি পরিবর্তনের জন‍্য দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হন তাহলে এই মারাত্মক রোগ থেকে মুক্তি সম্ভব।

পদক্ষেপ ১: আপনার সিদ্ধান্তের প্রতি অনুগত থাকা

আপনি যদি একবার নিজেকে মাদকের আসক্তির সাথে আবিষ্কার করেন তবে সেই পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে স্বীকার করা যে আপনার সমস্যা আছে। নিজেকে প্রতিবিম্বিত করা প্রয়োজন এবং আপনার নিজেকে বোঝাতে হবে যে আপনার পরিবর্তন প্রয়োজন। আসক্তি আপনাকে তলানিতে নিয়ে যাবে। ধীরে ধীরে আপনি আপনার বন্ধ, আত্মীয়স্বজনকে হারাবেন এমনকি আপনার পরিবারের সদস্যদের সাথেও আপনার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। সেজন্য আপনাকে নিজের সিদ্ধান্তের প্রতি অটল থাকতে হবে যে আপনি নিজেকে পরিবর্তন করবেন। আপনি যদি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন তাহলে কোনকিছুই আপনাকে থামাতে পারবে না।

পদক্ষেপ ২: সাহায্য চাওয়া এবং চিকিৎসা করানো

সাধারণত আপনার বন্ধু এবং পরিবারের কাছ থেকে আপনার সাহায্য এবং সমর্থন প্রয়োজন। এটাই সুবর্ণ সুযোগ আপনার বন্ধু এবং পরিবারের সদস‍্যদের জানানোর যে আপনার চিকিৎসা প্রয়োজন। এটি আপনার আরোগ্য লাভের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিবে এবং আপনাকে আপনার লক্ষ্যে স্থির থাকতে সাহায্য করবে। অনেকেই ভাবে যে তারা স্ব পুনরুদ্ধারের উপর নির্ভর করতে পারে। তবে যেটা সত‍্যি তাহল এটিকে আপনি সহায়তার ধরন হিসেবে ব‍্যবহার করতে পারে কিন্তু সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভের জন‍্য পেশাদারি সহায়তা প্রয়োজন। সেজন্য আপনাকে একটি পুনর্বাসন কেন্দ্রে যেতে হবে বা আপনার কাছের কারো কাছে এ ব‍্যাপারে সাহায্য চাইতে পারেন।

পদক্ষেপ ৩: আপনার দৈনন্দিন জীবনে পরিবর্তন আনুন

আপনি যদি কোনো আসরের মধ‍্যমনিতে পরিণত হন বা একাই মাদক গ্রহণ করেন সেক্ষেত্রে ছোট ছোট পরিবর্তন আরোগ্য লাভের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। আপনাকে মাদকের প্রতি আসক্ত করতে পারে এমন সব জিনিস নষ্ট করে ফেলতে হবে, পরিস্কার থাকতে হবে এবং সমস্যা থেকে দূরে থাকতে হব‍ে। আরোগ্য লাভের জন‍্য আপনার জীবনে পরিবর্তন আনতে যে জিনিসগুলো করতে হবে তার একটি তালিকা এখানে দেয়া হল-

  • মদ‍্যপান এবং পার্টি করা এড়িয়ে চলা। কারণ এগুলো আপনার মস্তিষ্কে আবার মাদক গ্রহণের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করতে পারে।
  • মাদকের সাথে জড়িত এমন সহচর বা বন্ধুদের থেকে দূরে থাকুন।
  • প্রতিদিন গোসল করুন এবং পরিস্কার থাকুন।
  • ভাল অভ্যাসের অনুশীলন করুন।
  • পুনুরায় ভালবন্ধু এবং পরিবারের সাথে সম্পর্ক তৈরি করুন।
  • আপনার আশাকে বাঁচিয়ে রাখুন যা আপনাকে বদলে দিবে।
  • প্রত‍্যেক মানুষেরই ত্রুটি আছে এবং প্রয়োজনে সাহায্য চাইতে কোনো লজ্জা নেই এটা মেনে নেয়া।

উপসংহার

সমাজে মাদক শব্দটি যেমন ভয়ংকর শোনায় তেমনি যারা মাদক গ্রহণ করে তারাও মানুষ, এটি আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। এটি অসুস্থতার একটি ধরন যা দিনের পর দিন তাদের জীবনকে প্রভাবিত করে। যদিও মাদক গ্রহণের ইচ্ছাটি স্বেচ্ছাচারিতা তারপরও পরিবর্তনের জন্য কারো কাছে সাহায্য চাওয়ার মধ‍্যে কোনো লজ্জা নেই। মাদকাসক্তি শরীরের জন‍্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে তবে আশার কথা হচ্ছে অনকগুলো উপায় রয়েছে যার মাধ্যমে আপনি মাদকাসক্তি থেকে মুক্ত হতে পারেন। মাদকাসক্তি জীবনকে যতই কঠিন করে তুলুক কখনো কারো জন্য বিকল্প হবেন না নিজেকে একা ছেড়ে দিন। যদি আপনার বন্ধু বা পরিবারের কোনো সদস্য মাদকে আসক্ত হয় তবে আপনার পরিবারের সদস‍্যকে সাহায্য করার ৫টি উপায় এখানে রয়েছে।

বিশ্বে আজ এমন অনেক সফল ব‍্যক্তি রয়েছেন যারা আগে মাদক সেবনের শিকার হয়েছিলেন। এটি থেকে কাটিয়ে উঠার সুবিধা আপনি নিঃসন্দেহে সারাজীবন পাবেন তাই আরোগ্য লাভের ক্ষেত্রে কখনও লজ্জা পাবেন না। আপনি যদি এই পদক্ষেপের মধ্যে দিয়ে যেতে না পারেন তবে জেনে রাখুন অসুস্থতা নিয়ে বেঁচে থাকা অনেক কষ্টকর। আর আপনার সহযোগীতার জন্য আমার হোম হচ্ছে শ্রেষ্ঠ রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার ।
আশা করি এই নিবন্ধটি আপনাকে মাদকাসক্তি কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে।